চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর

উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা), অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়

কোনো দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্য ঘাটতির নিরিখে মূল্যায়ন না করে আমদানির গঠন এবং তা দেশের উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কতটা অবদান রাখছে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানির ৮৫ শতাংশের বেশি মূলধনি যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল, যা দেশের শিল্প ও উৎপাদন কার্যক্রমে সরাসরি অবদান রাখে। তবে আগামী পাঁচ বছরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু বাণিজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং কৌশলগত অবকাঠামো, লজিস্টিকস ও আঞ্চলিক সংযোগ, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে অংশগ্রহণ, বিনিয়োগ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর—এ পাঁচটি আন্তঃসম্পর্কিত স্তম্ভের ভিত্তিতে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে রূপ নেবে।

সরকারের উদ্দেশ্য একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিনিয়োগনির্ভর এবং কর্মমুখী উন্নত দেশ গড়ে তোলা। সেজন্য বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে রূপান্তর করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেয়া হচ্ছে। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে একটি প্রতিযোগিতামূলক বাণিজ্য ও লজিস্টিকস কেন্দ্রে পরিণত করা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে বন্দর, রেল, সড়ক ও নৌপথের সমন্বিত ব্যবহার, কাস্টমস ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন এবং দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করা জরুরি। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরকে অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করা গেলে পরিবহন ব্যয় ও সময় উভয়ই কমবে। এক্ষেত্রে চীনের অভিজ্ঞতার সুযোগ নেয়ার জন্য ২০২৬ সালের জুনে China-Bangladesh Mongla Port Economic Zone-এর উন্নয়নে CCECC এবং আনোয়ারায় Chinese Economic and Industrial Zone-এর উন্নয়নে CRBC-এর সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর সময়াবদ্ধ বাস্তবায়ন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বাংলাদেশ চীনের Global Value Chain (GVC)-এর একটি সক্রিয় অংশীদার হতে চায়। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম উৎপাদনে যৌথ উদ্যোগের দিকে যেতে হবে। এজন্য চীনের প্রতিষ্ঠানগুলোর Supplier Development Programme-এর সঙ্গে বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা, আন্তর্জাতিক মান ও সনদায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় শ্রমিকদের কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় উপকরণের ব্যবহার উৎসাহিত করা হবে।

এর ফলে চীনের বিনিয়োগ শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং বাংলাদেশকে চীন ও বৈশ্বিক বাজারের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন ও রফতানি কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।

২০০১-২০২৫ সময়ে বাংলাদেশে মোট নিট FDI Stock প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার; এর মধ্যে চীনের অংশ প্রায় ১ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে বাংলাদেশে চীনের নিট FDI ছিল ৩২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৪ সালে ছিল ২০৮ মিলিয়ন ডলার। বর্তমানে চীনা বিনিয়োগের একটি বড় অংশ বিদ্যুৎ খাতে কেন্দ্রীভূত থাকলেও কৃষি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, টেলিকমিউনিকেশন, ঔষধ শিল্প, মূলধনি যন্ত্রপাতি প্রভৃতি খাতে বিনিয়োগের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। চীনের Global Value Chain-এর সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ জোরদার করতে এসব খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রফতানিমুখী যৌথ বিনিয়োগ প্রয়োজন।

চীনের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য হবে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বাংলাদেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি। শুধু Turnkey Project বা যন্ত্রপাতি আমদানির পরিবর্তে যৌথ অংশীদারত্বে বিনিয়োগ, লাইসেন্সিং, স্থানীয় প্রকৌশল সক্ষমতা বৃদ্ধি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, যৌথ গবেষণা এবং স্থানীয় উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। আইসিটি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইলেকট্রিক ভেহিকল ও ব্যাটারি, ঔষধ শিল্প, কৃষিপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোর মতো খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। বড় বিনিয়োগ ও অবকাঠামো প্রকল্পের চুক্তিতে বাংলাদেশী প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিল্প যৌথ গবেষণার সুযোগ অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

অবকাঠামো সহযোগিতা চীন–বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে থাকবে। তবে প্রকল্প নির্বাচন করতে হবে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক সুফল, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং পরিবেশ ও সামাজিক স্থায়িত্ব বিবেচনায় নিয়ে। চীনা অর্থায়ন ও কারিগরি সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে বন্দর ও রেল সংযোগ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, শিল্পাঞ্চলসংলগ্ন অবকাঠামো, নগর পরিবহন ও ডিজিটাল সংযোগে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। প্রতিটি প্রকল্পে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়, উপযুক্ত Financing Mix, সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাধীন পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় অংশগ্রহণ, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। Concessional Finance, Equity Investment এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে Public-Private Partnership (PPP)-এর মাধ্যমে ঋণঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করে এ সহযোগিতাকে আরো টেকসই করা সম্ভব।

যেকোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক, পারস্পরিক স্বার্থ ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কই একতরফা নির্ভরতার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না। বাংলাদেশ তাই এমন একটি কৌশলগত অংশীদারত্ব চায়, যেখানে উভয় দেশই পারস্পরিক সুবিধা ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে। বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু বাজার হওয়া বা অর্থায়ন গ্রহণ করা নয়; বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ, রফতানি, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে একটি সক্ষম ও কার্যকর অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রাখা। তাই আগামী দিনে চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শুধু বাণিজ্যনির্ভর সম্পর্ক থেকে একটি কৌশলগত, ভারসাম্যপূর্ণ ও টেকসই সার্বিক অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে উন্নীত করাই আমাদের উদ্দেশ্য।

আরও